জিয়া – রূপকথা নয়, মাটিতে নেমে আসা নায়কের নাম
- Created on Monday, 30 April 2018 15:35
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 1107
সাইদুল ইসলাম
জিয়া কোন রূপকথার চরিত্র নন। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে আসতে পেরেছিলেন, তাদের আশা, হতাশা এবং আবেগের বিষয়গুলি বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন এবং রাজনীতিতে তার সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। জিয়ার জন্মদিনে এই লেখাটি আবেগি লেখা হবেনা। চেষ্টা করব তথ্য উপাত্ত দিয়ে জিয়াকে তুলে ধরতে।
জিয়াউর রহমানের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি আর মৃত্যু ১৯৮১ সালের ৩০ মে। এই ৪৫ বছর ১৩০ দিনের জীবনে তিনি দুই দুই মহাদুর্যোগে ত্রাতা হিসাবে জাতির সামনে সিনা টানকরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রথমবার তাঁর ঘোষণায়, বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া জনতা, আধা সামরিক ও সামরিক বাহিনী যুথবদ্ধ হয়েছিল আর দ্বিতীয়বার তাঁর সাহসিকতায়রক্ষা পেয়েছিল সার্বভৌমত্ব। এর সাথে সাথে গতি পেয়েছিল অর্থনীতি, একদা তলাবিহীন ঝুড়ির গঞ্জনা সওয়া বাংলাদেশ বড় দেশের রাষ্ট্রনায়কদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা শিখেগিয়েছিল।
সীমিত অায়তন, সম্পদের স্বল্পতা ইত্যাদিকে দিয়ে দেশকে ছোট বড় বিবেচনা করার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তিনি সার্ক গঠনের উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন। ভারতের মত পরাক্রমশালীদেশও জিয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে জিয়ার নেতৃত্বের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রাচ্য পাশ্চাত্য সবখানেই ছিল তাঁর সমান গ্রহণযোগ্যতা। তুরস্কে তাঁর নামে সড়ক নির্মিত হয়েছে, মিসরের জনতা তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ পদক ‘অর্ডার অব দ্য নাইল’-এ ভূষিত করে ধন্য হয়েছে, মার্শাল টিটোর দেশ থেকে তিনি পেয়েছেন সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব দ্য ইয়োগোস্লাভ স্টার’।
জিয়া নিজেকে নিয়েই থাকেননি। আজ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি হিসাবে আমাদের যে পরিচয় তাও জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতার কারণে। তিনি ছিলেন দেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট এবং প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশের প্রশাসন, শিক্ষা, কৃষি, বিদেশ নীতি, অর্থনীতি, সংষ্কৃতি, শিল্প, ক্রীড়া, সবকিছুকে তিনি ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করেছিলেন। করে গেছে মাত্র যুগের সংঘাতময় সীমিত সময়ে।
দেশের সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্যে তিনি গণশিক্ষার যে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন সেটি চালু থাকলে দেশে সাক্ষরতার হার অন্তত কুড়ি শতাংশ বেশি থাকত। বিষয়টা সম্পর্কে যারা দ্বিমত পোষণ করেন তাদের জন্যে একটি সহজ হিসাব দেই। আমাদের সময় এসএসসি পরীক্ষায় গণ শিক্ষা বলে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় ছিল। তার কার্যক্রমে প্রতিটি পরীক্ষার্থীকে একজন নিরক্ষর মানুষকে লেখাপড়া শেখাতে হত। আমরা ১৯৮০ সালে এসএসসি পাশ করেছি। তারপর আরও অন্ততঃ ৩৭ লক্ষ মানুষ এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে তারমানে আরও অন্ততঃ ৩৭ লক্ষ সাক্ষর মানুষ।
খাল খনন করে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের যে পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন সঠিক বাস্তবায়ন হলে কৃষির উন্নতির সাথে সাথে বিদ্যুতেরও সাশ্রয় হত। গ্রীস্মে পর্যাপ্ত পানি জমা থাকলে সেইপানিতে মৎস্য চাষ করে মাছের কিছুটা হলেও পুষ্টির চাহিদা মেটানো যেত।
জিয়া যখন ক্ষমতায় আসেন তখন দেশের বাজেট ছিল পনর শ’ কোটি টাকা। জিয়া শাসনের শেষ বছরে সেই বাজেট চারহাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছিল । জিয়ার বিদেশনীতির কারণে বিশ্বব্যাপী আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসতে থাকে, পরবর্তী সরকারগুলি সেটি কাজে লাগাতে পেরেছেন।
দেশের গুণী মানুষদের স্বীকৃতি দেবার জন্যে জিয়ার সময় স্বাধীনতা পদক এবং একুশে পদক চালু হয়, শিশুদের জন্যে চালু হয় নতুন কুড়ি। জিয়া ছিলেন তাঁর স্কুল হকি দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। সেনাবাহিনীতে তিনি বক্সিং, বাস্কেট বল এবং হকি খেলেছেন। খেলাধুলার প্রতি তাঁর অনুরাগের প্রতি ফলন ঘটেছে জাতীয় ক্রীড়া পুরষ্কার প্রচলনের মধ্যে দিয়ে। হ্যা, এইপুরষ্কারটিরও প্রচলন জিয়ার আমল থেকেই।
অবিন্যস্ত সশস্ত্র বাহিনীর সংষ্কার এবং বিস্তারও জিয়ার আমলে শুরু হয়েছিল। এই সংষ্কারের সময় জিয়াকে অনেক বাধার পাহাড় ডিঙোতে হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধ করা, না করা,প্রশিক্ষণের মেয়াদ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইত্যাদি নানা কারণে সশস্ত্রবাহিনী বিভক্ত ছিল । পাকিস্তানে কমিশন প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মন ও মননে পার্থক্য যেমন ছিল, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া এবং পাকিস্তানে আটকে পড়া অফিসারদের মধ্যে বিভক্তি তার চেয়ে কম ছিল না। দেশে থেকেও যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চাকরিতে সক্রিয়ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর যারা কমিশন পেয়েছিলেন তাদের মধ্যেও সমঝোতার সংকট ছিল। তারপর ছিল রক্ষীবাহিনী থেকে আত্ত্তীকৃত অফিসার ও জেসিও।
এই সকল দলকে এক সমতলে আনার দুর্লংঘ্য প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করে তিনি এক ডিভিশনের অবিন্যস্ত সেনাবাহিনীকে পাঁচ ডিভিশনের চৌকশ সেনাবাহিনীতে রূপ দিয়ে ছিলেন। তিনটি গান বোটের নেভিকে তিনি যুদ্ধোপযোগি নৌবাহিনীতে পরিণত করেছিলেন। বিমান বাহিনীও বিস্তৃত হয়েছিল সম্মানজনক বহরে। মিলিটারি একাডেমি, নৌ একাডেমি এবংবিমান বাহিনী একাডেমি প্রাণ পেয়েছিল তাঁর ছোঁয়ায়। সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চ শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জিয়া।
বাংলাদেশের অন্যন্য নেতার তুলনায় জিয়া ছিলেন এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। ক্ষমতায় আসার পর যেখানে অন্যদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে জিয়ার বেলায় হয়েছিল তার উল্টো। বিরোধীদলের সমালোচনা সত্ত্বেও ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন জিয়া।
বাংলাদেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট জিয়া শুভ সংখ্যা ৭ এর মতই জনগণের কাছে ছিলেন সৌভাগ্যের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুতে শোকের সাগরে ভেসেছিল সারা দেশ। তাঁর জানাজায় মানিকমিয়া এভিনিউতে যে বিশাল জনসমাগম ঘটেছিল। অগনণত মানুষের চোখের জলের সে দৃশ্য এর আগে বা পরে মানিক মিয়া এভিনিউতে আর কেউ এযাবতকালে অার কেউ দেখেনি।
তথ্য সূত্র –
তাজউদ্দিনের বক্তব্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল্পত্র তৃতীয় পত্র পৃষ্ঠা ৭
https://en.wikipedia.org/wiki/Order_of_the_Yugoslav_Star
https://en.wikipedia.org/wiki/Order_of_the_Nile
http://www.poimap.com/…/ankara_cankaya_birlik_neighbourhood…
http://en.prothomalo.com/…/…/Chronology-of-budget-since-1972
https://en.wikipedia.org/wiki/Ekushey_Padak
https://en.wikipedia.org/wiki/Independence_Day_Award
https://bn.wikipedia.org/…/%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A…
https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_Army
https://www.dscsc.mil.bd/
https://en.wikipedia.org/…/South_Asian_Association_for_Regi…
মহানায়কের সঙ্গে হিজবুল বাহারে
- Created on Monday, 30 April 2018 15:30
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 1073
হুমায়ুন কবির
আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব, আমার আদর্শ, আমার মহানায়ক – বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। তাঁর সাথে আমার কিছু প্রত্যক্ষ স্মৃতি, কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত আছে। যেমন, আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন প্রেসিডেন্ট জিয়ার সেই বহুল আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়েই আমরা জিয়ার অনুসারী হয়ে যাই, বঙ্গভবনে কৃতি ছাত্রদের সংবর্ধনা, হিজবুল বাহার জাহাজে ইন্দোনেশিয়া-সিঙ্গাপুর ভ্রমণ, তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় যাওয়া।
জিয়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কিছু লেখার জন্য সব সময়ই বন্ধুরা আমাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার তাঁকে নিয়ে যখনই কিছু লেখার চেষ্টা করি, আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই!
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করতেন। তাঁর আমলে নিয়মিতভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান অর্জনকারীদের বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ করা হতো। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজে উপস্থিত থেকে মেধাবীদেরকে সংবর্ধনা দিতেন এবং ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেমবোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। তাদের সাথে নিয়ে হিজবুল বাহার জাহাজে করে কয়েক বার তিনি সমুদ্রভ্রমণে গিয়েছিলেন। ওই ভ্রমণে সঙ্গী করা হতো দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের, যাতে তাঁদের সংস্পর্শে এসে নবীন মেধাবীরা অনেক কিছু জানতে পারে। হিজবুল বাহারে তিনি নিজেও নবীন মেধাবীদের সঙ্গে নিজের ভাবনাগুলো শেয়ার করতেন। আবার আমাদের ভাবনাগুলোও গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং অনুধাবন করতেন।
আজ আমি আমার মহানায়কের সাথে হিজবুল বাহারে ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করবো।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে তিনবার ভ্রমণে গিয়েছিলেন। একবার গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম থেকে সুন্দরবন। দুইবার গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর-ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় আমারও সেই সফরে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। চার দিন-রাত তিনি আমাদের সঙ্গে থেকে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সম্পদ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন এই মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার।
হিজবুল বাহারে যাত্রী সংখ্যা ছিল দুই হাজার। এর মধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, সাংস্কৃতিক কর্মী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদও ছিলেন।
১৭ই জানুয়ারি, ১৯৮১, দুপুর ১২ টায়, হিজবুল বাহার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সুন্দরবনের সঙ্গম স্থলের অদূরে হিরণ পয়েন্ট হয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি সিঙ্গাপুর-ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে।
সন্ধ্যা ৭ টা। জাহাজের তেতলায় সবাই জমায়েত হয়েছেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট জিয়া ছাত্র-ছাত্রীদের সাক্ষাৎ দেবেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নিরাপত্তা রক্ষীদের কর্ডন ভেদ করে প্রেসিডেন্ট এগিয়ে আসেন। সমবেত সবাই দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্টকে সম্ভাষণ জানান। তিনি হাতের ইশারায় আমাদের বসতে বললেন। আমরা বসা মাত্রই বিএনপি মহাসচিব ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী মাইকটি প্রেসিডেন্টর সামনে এগিয়ে দিলেন। তাঁর বিখ্যাত কালো চশমার ভেতর দিয়ে দেশের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের দলটাকে কয়েক মুহূর্ত অবলোকন করে প্রেসিডেন্ট স্বভাবসুলভ সৌজন্য প্রকাশের পর বক্তৃতা শুরু করলেন।
ভরাট কণ্ঠে বললেন –
“শোনো ছেলেমেয়েরা, আমি তোমাদের বাংলাদেশের ডাঙা থেকে উত্তাল বে অব বেঙ্গলের মধ্যখানে নিয়ে এসেছি। সমুদ্র হলো অন্তহীন পানির বিস্তার ও উদ্দাম বাতাসের লীলাক্ষেত্র। সমুদ্রে এলে মানুষের হৃদয় সমুদ্রের মতো বিশাল, উদার ও উদ্দাম সাহসী হয়ে উঠতে বাধ্য। আমি কি ঠিক বলি নি?”
আমাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সরাসরি প্রশ্ন করলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। কেউ কোনও কথা বললো না। ক্ষণকাল বিরতি দিয়ে তিনি নিজেই তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করলেন –
“আমি ঠিকই বলেছি। তোমার – আমার – বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের – সংকীর্ণতা ও কূপমন্ডুকতাকে পরিহার করে সমুদ্রের মতো উদার ও ঝড়ো হাওয়ার মতো সাহসী হতে হবে।”
“আমি তোমাদের কাছে এখন যে কথা বলবো তা আমাদের জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক তাগিদ। এই তাগিদকে স্মরণীয় করার জন্য আমি একটা পরিবেশ খুঁজছিলাম। আমরা এখন বঙ্গোপসাগরের মাঝে। এই উপসাগরেই রয়েছে দশ কোটি মানুষের উদরপূর্তির প্রয়োজনেরও অতিরিক্ত আহার্য ও মূল ভূমি ভেঙে আসা বিপুল পলিমাটির বিশাল দ্বীপদেশ যা আগামী দু-তিন প্রজন্মান্তরেই ভেসে উঠবে – যা বাংলাদেশের মানচিত্রে নতুন বিন্দু সংযোজনের তাগিদ দেবে। মনে রেখো, আমাদের বর্তমান দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অসহায়তা আমাদের উদ্যমহীনতারই আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তিমাত্র। এর জন্য অন্যের চেয়ে আমরাই দায়ী বেশি।”
“আমাদের ভিটা ভাঙা পলি যেখানেই জমুক – তা তালপট্টি কিংবা নিঝুম দ্বীপ হোক – এই মাটি আমাদের। দশ কোটি মানুষ সাহসী হলে আমাদের মাটি ও সমুদ্র-তরঙ্গে কোনও ষড়যন্ত্রকারী নিশান উড়িয়ে পাড়ি জমাতে জাহাজ ভাসাবে না।”
“মনে রেখো, আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা দশ কোটি মানুষ একতাবদ্ধ নই বলে শত্রুরা, পররাজ্য লোলুপ রাক্ষসেরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এই স্বাধীন জলাধিকারে আনাগোনা শুরু করেছে। তোমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়ে, দেশের দরিদ্র পিতামাতার সর্বশেষ আশার প্রদীপ, তোমাদের ওপর ভরসা করে আছে সারাদেশ, সারা জাতি। তোমরাই হলে বাংলাদেশের হাজার বছরের পরাধীনতার কলঙ্ক মোচনকারী প্রত্যাশার আনন্দ-নিঃশ্বাস। ইতিহাসের ধারায় দৃষ্টিপাত করলেও তোমরা জানবে এই সমুদ্র ছিল আমাদের আদিমতম পূর্বপুরুষদের নৌশক্তির স্বাধীন বিচরণভূমি। এমন কি বৌদ্ধযুগে পাল রাজাদের অদম্য রণপোতগুলো এই জলাধিকারে কাউকেই অনধিকার প্রবেশ করতে দেয় নি। এদেশেই জন্ম নিয়েছেন ঈশা খাঁ, তীতুমীর, হাজী শরিয়ত উল্লাহদের মতো সাহসী সন্তান। সন্দেহ নেই আমাদের সেই পূর্বপুরুষগণ ছিলেন যথার্থই শৌর্যবীর্যের অধিকারী। তখন তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় নগণ্য। কিন্তু আমরা সারাটা উপমহাদেশ আর অসমুদ্র হিমাচল শাসন করেছি। বলো, করি নি কি?”
প্রেসিডেন্ট তাঁর সামনে বসা শত শত ছাত্রের মধ্যে থেকে হঠাৎই আমার দিকে আঙুল তুলে বললেন,
“তুমি দাঁড়াও…”
আমি ভয়ে থতমত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেলাম! কোনও ভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়ালাম।
তিনি আবার বললেন, “কি আমাদের পূর্বপূরুষ কি আসমুদ্র হিমাচল শাসন করেন নি?”
আমি মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলাম, “জ্বী স্যার, করেছেন।”
আমার উত্তরের সাথে সাথে তিনি অনেকটা হুংকার দিয়ে বললেন, “আলবৎ করেছেন।”
এরপর তিনি সমবেতদের উপর এক দৃষ্টিতে কি যেন দেখলেন… সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলে?” প্রায় দুই হাজার ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে মোট ৬ জন হাত তুললেন – যাদের মধ্যে আমিও একজন। আমাদের সঙ্গী ছাত্রদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র ছিলেন- এনামুল করিম শহীদ, গোলাম হোসেন, মিয়া শহিদ হোসাইন, গোলাম সরওয়ার মিলন, কাজী সিরাজ – এঁরা সবাই ছাত্র দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতা-কর্মী এবং আমার থেকে সবাই অনেক সিনিয়র। মহানায়ক আমাকে কাছে ডাকলেন এবং সকলের উদ্দেশ্য বললেন –
“তোমরা কি জানো হুমায়ুন কবির একজন মেধাবী ছাত্রই নয় একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধাও?”
মেধাবী ছাত্রদের সংবর্ধনায় আমিও আমন্ত্রিত হয়ে কয়েক বছর আগে যখন বঙ্গভবনে গিয়েছিলাম সেই সময় প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীদের সংক্ষিপ্ত বায়োডাটা দেয়া হয়েছিল – সেখানে আমার কিশোর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছিল। আমি অবাক হলাম – আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের ছোট্ট বায়োডাটাও কত মনোযোগ দিয়ে তিনি পড়েছেন এবং আজও মনে রেখেছেন!
প্রেসিডেন্ট আমাকে ইঙ্গিত করে উল্লাস প্রকাশ করে হাসলেন। তারপর নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন –
“তুমি কি আমাদের সেই পূর্বপুরুষ বীরদের কারও নাম জানো?”
আমি বললাম – “জানি। রাজা মহীপাল, বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁ…”
প্রেসিডেন্ট আমার জবাবে চমৎকৃত হয়ে বললেন, “ইউ আর রাইট মাই, সান। তুমি কি ইতিহাসের ছাত্র?”
“নো, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমি পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ছাত্র।”
প্রেসিডেন্ট জিয়া খুশিতে স্বভাবসুলভ দুই হাত উঁচু করে হাততালি দিলেন। সাথে সাথে পুরো জাহাজ জুড়ে সবাই হাততালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দিত করলেন এবং প্রেসিডেন্টের ইঙ্গিতে আমি বসে পড়লাম।
ভাষণ আবার শুরু হলো…
“প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বজাতির মধ্যে মেধারও অভাব নেই। এই ছেলেটির কথাই ধরা যাক না। সে লোক প্রশাসনের ছাত্র কিন্তু আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়েও সচেতন। এরাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। শোনো ছেলেমেয়েরা, আমি তোমাদের সান্নিধ্য পেয়ে খুবই খুশি। ৫ দিন ও ৫ রাত আমরা এই দরিয়ায় নোনা বাতাসে দম ফেলতে এসেছি। এখন এই জাহাজটিই হলো বাংলাদেশ। আর আমি হলাম তোমাদের ক্যাপ্টেন।”
“আমি চাই আমাদের দেশের প্রতিভাবান ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা চাক্ষুষ পরিচয় ও বন্ধুত্বের আদান-প্রদান হোক। চেনা-জানা থাকলে পারস্পরিক আত্মীয়তা রচিত হয়। হয় না কি?”
সবাই আমরা এক সাথে জবাব দিলাম – “ইয়েস, মিস্টার প্রেসিডেন্ট।”
আমাদের সাথে ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতারা। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী এস এ বারী এটি, পরিকল্পনা মন্ত্রী ড, ফসিউদ্দিন মাহতাব, ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর নাম মনে আছে। সাংবাদিকদের মধ্যে আখ্তার-উল্-আলম, আহমেদ হুমায়ুন, শাহাদাত চৌধূরী, হেদায়েত হোসাইন মোরশেদের কথা মনে আছে। শিল্পীদের মধ্যে আপেল মাহমুদ, আঞ্জুমান আরা বেগম, শবনম মুশতারী ছিলেন। আমাদের ছাত্রদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখনকার তরুণ শিক্ষক ডক্টর খন্দকার মোশারফ হোসেন। তবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সামনে আমরা, আমাদের সঙ্গী সকলেই ছেলেমানুষ এবং ‘একান্ত বাধ্যগত ছাত্র’, অন্যদিকে মহামান্য প্রেসিডেন্ট আমাদের সেই রূপকথার রাজা।
প্রেসিডেন্ট মাইকটা সরিয়ে সামনে বসা বাংলাদেশের মেধাবী তরুণ-তরুণীদের আশা ও রোমাঞ্চে শিহরিত মুখগুলো এক নজর দেখে নিলেন। তিনি স্ট্যান্ড থেকে মাইকের মাউথপিসটা হাতে নিয়ে বললেন –
“আমি তোমাদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপর্ণ তথ্য ব্যক্ত করতে চাই – মনোযোগ দিয়ে শোনো।”
“আমাদের রয়েছে দুনিয়ার সব থেকে উর্বর জমি। একটু পরিশ্রমেই ফসলে ঘর ভরে যেতে পারে। কিন্তু অর্থের অভাবে কোনও বৈজ্ঞানিক চাষের উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না। কে আমাদের বিনা স্বার্থে এই উদ্যোগে সহায়তা করবে? কেউ করবে না। অথচ যে সম্পদের বিনিময়ে অর্থের প্রাচুর্য ঘটে তা আমাদের দেশের ভেতরেই জমা আছে। আমরা তা তুলতে পারছি না।”
“কি সেই সম্পদ যা আমরা তুলতে পারছি না? তোমরা কি জানো সেই লুক্কায়িত সাত রাজার ধন কি? কোথায় সেগুলো আছে? সেই সাত রাজার ধন হলো তেল, গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর – আরও অনেক কিছু।”
আমাদের সফরসঙ্গী সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী রিটা রহমান (মশিউর রহমান যাদু মিয়ার কন্যা) প্রশ্ন করলেন, ‘গ্যাস তো আমরা খানিকটা পেয়েছি। আমাদের কি তেল মানে পেট্রোল ডিজেলও আছে?
“হ্যাঁ। গ্যাস আমরা খানিকটা তুলেছি বটে। তবে এর বিপুল ভা-ারে এখনও হাত দিই নি। গ্রামে গ্রামে জ্বালানি সরবরাহের জন্য তিতাস, বাখরাবাদের মতো অসংখ্য গ্যাস কেন্দ্র দরকার। দরকার দেশে কোনও কোনও অঞ্চলের গ্যাসের পরের স্তর থেকে তেল নিংড়ে বের করে আনা।” বেশ দৃঢ়তাব্যাঞ্জক এক কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো প্রেসিডেন্ট জিয়ার আবেগহীন উচ্চারণভঙ্গি থেকে।
এবার অন্য একটি মেয়ে উঠে দাঁড়ালো।
প্রেসিডেন্ট জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি কিছু বলবে?”
– জ্বী স্যার, আমাদের কি তবে জ্বালানি তেলও আছে?
প্রেসিডেন্ট তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাকে হাতের ইঙ্গিতে বসতে বললেন। প্রেসিডেন্ট তাঁর পাশে সিকিউরিটি অফিসার কর্নেল মাহাফুজের হাতে ধরা একটা ছোট্ট ব্যাগের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কর্নেল মাহফুজ দ্রুত ব্যাগ খুলে একটা বোতল বের করে তাঁর হাতে দিলেন। প্রেসিডেন্ট বোতলটা হাতে নিয়ে একটা ঝাঁকুনি দিলেন। বোতলে ফেনায়িত হলুদ তরল পদার্থ ঝলকাচ্ছে।
“এই বোতলেই আছে বাংলাদেশের পেটের ভেতরে লুক্কায়িত সাত রাজার ধন পেট্রোল। বিশুদ্ধ পেট্রোল। যা পুড়িয়ে বিমান, গাড়ি, অসংখ্য ভারি যানবাহন, সমুদ্রে জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। শক্তির ধাত্রী এই তেল। আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তোমরা ভালো করে দেখে রেখো ছেলেমেয়েরা, আমার হাতের মুঠোয় রয়েছে সেই মহার্ঘ্য নিয়ামত যা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে, মাটির উদরে তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। যা ক্রমাগত বাধার ফলে আমি শত চেষ্টা সত্ত্বেও তোমাদের ভাগ্য ফেরাতে তুলে আনতে পারছি না।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে প্রেসিডেন্ট একটু ক্লান্ত কিংবা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি আবেগ বিহ্বলের মতো একটু পাশ ফিরে ডা. চৌধুরীর দিকে তাকালেন। তারপর মুহূর্তের মধ্যে মুখ ফিরিয়ে শ্রোতাদের স্তব্ধতা উপলব্ধি করে শান্ত কন্ঠে বললেন, “আমার জীবৎকালে সম্ভবপর না হলে তোমরা, আমার ছেলেমেয়েরা, এই তেল তুলবে।”
তাঁর কথায় একটা গভীর স্তব্ধতা নেমে এলো। কারও মুখে কোনও কথা নেই। সাহস নেই কোনও সম্পুরক প্রশ্ন উত্থাপনের। স্তব্ধতার মধ্যে জাহাজের গায়ে ক্রমাগত আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ফোঁপানি শোনা যাচ্ছে।
কবি আল মাহমুদের নির্দেশে সাংস্কৃতিক দল জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান “কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট, শিকল পুজার পাষাণবেদী” – গেয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করলো।
ড্রাম তবলা ও অন্যান্য সংগীত যন্ত্রের সম্মিলিত শব্দে জাহাজ তথা আমাদের অনুষ্ঠান কেন্দ্রের গুরুগম্ভীর ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে অন্তর্হিত হয়ে হঠাৎ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠলো। শ্রোতারা হাততালি দিয়ে শিল্পীদের সাথে গলা মেলাতে শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট নিজেও হাততালি দেন। এমন কি তাঁর দেহরক্ষী এবং উপস্থিত নাবিকগণও।
আমি প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি তালি বাজিয়ে সকলকে উৎসাহ দিচ্ছেন। কয়েকটি গান শুনে সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সেন্ট্রি সচকিত হয়ে তাঁর জন্য পথ তৈরি করলো। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। স্বাভাবিক সৌজন্য সহ তিনি তাঁর কেবিনের দিকে হাঁটতে লাগলেন।
১৯শে জানুয়ারি সকালে জাহাজের ক্যাপ্টেন প্রেসিডেন্টর সামনে একটি কেক নিয়ে আসেন এবং বলেন, ‘স্যার, আজ আপনার জন্মদিন। আমরা আপনার জন্মদিন পালন করবো।’ তিনি মৌন সম্মতি দিলেন এবং সকলের অনুরোধে কেক কেটে তাঁর ৪৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করলেন। এটাই তাঁর জীবনে প্রথম এবং শেষ জন্মবার্ষিকী পালন।
১৯৮১-র পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু আজও ভুলতে পারি নি হিজবুল বাহারে প্রেসিডেন্ট জিয়া, আমার মহানায়কের দেয়া সেই আবেগময় বক্তৃতা। হয়তো কোনও দিন ভুলতে পারবো না।
– লেখক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট ও ব্যবসায়ী।
বিএনপির প্রতিষ্ঠা ও আজকের বাস্তবতা
- Created on Monday, 30 April 2018 15:33
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 1145
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময়টি দেশের ইতিহাসে ক্রান্তিকাল হিসেবে চিহ্নিত। বিএনপি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে হলে এই দল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট নিয়েও কিছু আলোচনা প্রয়োজন। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশে ঊষালগ্নেই মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, জনগণের প্রত্যাশা এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে চরম আঘাত আসে। স্বাধীন দেশের সংবিধানে চার মূলনীতির মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। শুধু ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা, সমাজতন্ত্রের নামে লুণ্ঠনে অর্থনীতি এবং ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতার কর্মকাণ্ডে জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চার মূলনীতির অন্যতম উপাদান গণতন্ত্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। আশাহত যুবসমাজের অনেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে সর্বহারা পার্টি ও গণবাহিনীসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন সৃষ্টি করে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির ফলে ১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলাসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ‘রক্ষীবাহিনী’ নামে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে। বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত রক্ষীবাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, গণতন্ত্রকে পদদলিত করে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠা করে।
‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত চারটি সংবাদপত্র ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হলো। বিভীষিকাময় এক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় জীবনে এক মর্মান্তিক ও কলঙ্কময় ঘটনার মাধ্যমে বাকশালের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগের এক নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতারা ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং দেশে সামরিক আইন ঘোষণা করেন। সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে ১৯৭৫ সালের ১ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে অনিশ্চয়তা ও চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ৭ নভেম্বর, সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতির ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। খন্দকার মোশতাক আহমদ সরকারের পতন হয় এর আগেই। প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২১ এপ্রিল, ১৯৭৭ তারিখে লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
জিয়া শাসনভার গ্রহণ করে সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ পরিবর্তে ‘আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও সব ধর্মের সমান অধিকার’ এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পরিবর্তে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক মানবমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ সংবিধানে প্রতিস্থাপন করেন। তিনি আমাদের পবিত্র সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ স্থাপন করেছেন।
দেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক শূন্যতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর যে আঘাত হানা হয়েছিল, তা পূরণের জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া নতুন দিকনির্দেশনা, নীতি ও দর্শন জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। জনগণ সেই নীতি ও দর্শনকে গণভোটের মাধ্যমে অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করেছে। এমনিভাবে সৃষ্ট প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির স্বার্থে শহীদ জিয়া তার নীতি, আদর্শ ও দর্শনকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম বা দল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন। এ লক্ষে তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮ তারিখে ‘জাগদল’, ১ মে, ১৯৭৮ ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ এবং পরিশেষে ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির গঠনতন্ত্রের দুই অনুচ্ছেদের ১৭টি উপ-অনুচ্ছেদে দলের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। দলের ঘোষণাপত্রে ২৯টি অনুচ্ছেদে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দলের কয়েকটি মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এ পর্যায়ে উল্লেখ করা হলো। (ক) বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক ইস্পাত কঠিন গণঐক্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও গণতন্ত্র সংরক্ষিত ও সুসংহত করা। (খ) ঐক্যবদ্ধ ও পুনরুজ্জীবিত জাতির অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও বহিরাক্রমণ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করা। (গ) উৎপাদনের রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং জনগণের গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক মানবমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জন। (ঘ) জাতীয়তাবাদী ঐক্যের ভিত্তিতে গ্রামগঞ্জে জনগণকে সচেতন ও সুসংগঠিত করা এবং সার্বিক উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা ও প্রকল্প রচনা এবং বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও দক্ষতা জনগণের হাতে পৌঁছে দেয়া। (ঙ) এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে গণতন্ত্রের শিকড় সমাজের মৌলিক স্তরে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়। (চ) এমন একটি সুস্পষ্ট ও স্থিতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চয়তা দেয়া, যার মাধ্যমে জনগণ নিজেরাই তাদের মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি আনতে পারবে। (ছ) বহুদলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের মাধ্যমে স্থিতিশীল গণতন্ত্র কায়েম করা এবং সুষম জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনয়ন।
এই কয়েকটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশের অন্যান্য দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ধারা থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সম্পূর্ণ আলাদা রাজনৈতিক ধারার ধারক ও বাহক। যখনই ভোট দেয়ার সুযোগ হয়েছে, তখনই জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, দেশের মানুষ বিএনপির রাজনৈতিক ধারাকে বিপুলভাবে সমর্থন করে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের ফলে ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) এবং ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয়েছিল এবং দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিল। বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া ও তার দলের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে শাহাদাতবরণ করতে হয়। যে দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও বহিরাক্রমণ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করার অঙ্গীকার রয়েছে, সে দলের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র অপ্রত্যাশিত নয়। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা বলেছিলেন, ‘জিয়াবিহীন বিএনপির শূন্য অবস্থান হবে’।
শহীদ জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়া ১০ জানুয়ারি ১৯৮৪ বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণিত করে দল আরো শক্তিশালী হতে সমর্থ হয়েছে। বিএনপিকে ভাঙতে বা দুর্বল করার লক্ষ্যে একাধিকবার এই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। এরশাদের সামরিক শাসনামলে ‘হুদা মতিন বিএনপি’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ওয়ান-ইলেভেনের ‘ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের’ সময়ে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁঁইয়াকে ব্যবহার করে ‘সংস্কারপন্থী বিএনপি’ গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে ভাঙার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শহীদ জিয়ার আদর্শের তৃণমূল নেতা ও কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের মুখে সব ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বর্তমানেও বিএনপিকে মামলা, হামলা, গুম, খুন ও মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি গ্রিক উপাখ্যানের ‘ফিনিক্স পাখির’ মতো মৃত্যুঞ্জয়ী। ‘ফিনিক্স পাখির’ যেমন মৃত্যু নেই, বিনাশ নেই, তেমনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলেরও ধ্বংস নেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলের ইতিহাস বারবার এ কথাই প্রমাণ করেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ‘বাকশাল’-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত; বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত এবং আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি। জঙ্গি ভীতিতে আতঙ্কিত জনপদ। দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আজ নিত্যদিনের বিষয়। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। শেয়ার মার্কেট ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটের মহোৎসব চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভও ডাকাতি হয়েছে। কোনো দেশের রিজার্ভ ব্যাংকে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার নজির নেই। সমাজের সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে বসেছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, প্রকল্পগুলোতে বর্তমানে ‘পুকুর চুরি হয় না, সাগর চুরি’ হয়। সরকার স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করেছে। দেশে চলছে অলিখিতভাবে ‘বাকশালী’ শাসনব্যবস্থা।
স্বাধীনতার পরবর্তীকালে ‘বাকশালী’ শাসনব্যবস্থা যেভাবে দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা এবং একটি ক্রান্তিকাল সৃষ্টি করেছিল, আজ একই অবস্থা বিরাজ করছে। বাকশাল সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে যে দলটি শহীদ জিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বর্তমান রাজনৈতিক শূন্যতা ও সঙ্কট থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র শহীদ জিয়ার আদর্শের সে দল বিএনপি। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বর্তমান অনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর কোনো দেশে স্বৈরাচার, একনায়কত্ব এবং ফ্যাসিবাদী সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। বাংলাদেশেও তার কোনো ব্যতিক্রম হবে না।
জনগণকে এ সরকারের জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার ঐতিহাসিক দায়িত্ব জনগণের বিশ্বস্ত ও জাতীয়তাবাদী শক্তির সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের। বর্তমান ক্রান্তিকালে দলকে আরো সুসংগঠিত, সাংগঠনিকভাবে অধিকতর শক্তিশালী এবং সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে অনির্বাচিত, ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করাই আজ সময়ের দাবি। ‘স্বৈরাচার হঠাও, দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া জাতির সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান।
সৌজন্যে – দৈনিক নয়াদিগন্ত ।
স্বাধীনতাযুদ্ধ ও দেশ গঠনে জিয়ার অবদান
- Created on Monday, 30 April 2018 15:29
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 1111
ড. মো: মোর্শেদ হাসান খান
স্বাধীনতার চার দশক পর বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে পথ চলছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। জাতীয় জীবনের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে আজ এমন একজন মানুষ সম্পর্কে দু-চারটি কথা লিখতে যাচ্ছি, যিনি জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে। তিনি আর কেউ নন- তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে সুপরিচিত, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বর ঘৃণ্য হামলা চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। শেখ মুজিবুর রহমানের দিকনির্দেশনায় কিছুটা কমতি থাকায় পাক বাহিনীর গণহত্যা ও প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখে জাতি যখন হতাশ ও বিভ্রান্ত, ঠিক তখনই আশার আলোকবর্তিকা হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সে দিনের মেজর জিয়াউর রহমান।
নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে বিদ্রোহ করেন এবং তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দল, মত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এতে জাতি উজ্জ্বীবিত হয়েছিল। তিনিই প্রথম পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত করেন। ২৫ মার্চ রাতে তিনি যখন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করলেন, তখন তিনি দেখলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যসংখ্যা মাত্র ৩০০। তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক ছিলেন। মাত্র সাতজন অফিসার এবং ৩০০ সৈন্য নিয়ে ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য ও অপ্রতুল অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি তার বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এই বিদ্রোহ ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ, যা জিয়াউর রহমানের মতো নায়কের পক্ষেই সম্ভব ছিল। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে জিয়াউর রহমান এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তী সময়ে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। রণাঙ্গনে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সবসময় সামনে থাকতেন এবং কমান্ডারদের সৈনিকদের সামনে থাকতে পরামর্শ দিতেন। এভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ এর জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও তারপর জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশ নেন।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের দু’দিন আগে সিলেটের এমসি কলেজের পাশ দিয়ে সিলেট শহরে ঢোকার আগে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাপক গোলাবর্ষণের শিকার হয়েছিল জিয়ার বাহিনী। এ পরিস্থিতিতে সহকর্মীরা তাকে পিছিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেন সবাই মরে গেলেও সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, বিশেষ করে রণক্ষেত্রে তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। রণক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা অনেক আগের। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি অসাধারণ রণনৈপুণ্য দেখিয়ে সবার দৃষ্টি কাড়েন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে ওই যুদ্ধে অংশ নেন। পাক-ভারত যুদ্ধে তার আলফা কোম্পানি সবচেয়ে বেশি নৈপুণ্য দেখিয়েছিল। তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি জিয়াকে চিনতেন না। ১৯৭১-এর আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি ভিন্ন্ ধরনের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তিনি অসীম সাহস ও বীরত্ব দেখান। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যুদ্ধ শেষে তিনি আবার তার কর্মস্থলে ফিরে যান, যা ছিল বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানকে কেউ খাটো করে দেখলে ভাবতে হবে সে একজন মূর্খ, সে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানে না এবং জানে কিন্তু অস্বীকার করে সে একজন জ্ঞানপাপী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সে দিন জিয়ার অগ্রণী ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে স্বীকার না করা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জিয়াউর রহমানের অবদান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে সিপাহি-জনতা। ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে এদেশের রাজনীতির গতিপথ নতুন করে নির্মাণ করে। তৎকালীন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য রাতের আঁধারে বিদ্রোহ করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ৩ নভেম্বর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করেন। ওই দিন জাতীয় চার নেতাকেও জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মুশতাককে পদচ্যুত করে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। ৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমান বন্দী হওয়ার পর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এ চার দিন দেশ ও দেশের জনগণ দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। ৭ নভেম্বর রাত প্রায় ১টার সময় সশস্ত্রবাহিনীর পুনরুত্থানকারী চক্রের বিরুদ্ধে বীর জনগণ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহিরা বিপ্লব ঘটিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন।
সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবের চার দিনের দুঃস্বপ্নের ইতি হয়। আওয়াজ ওঠে, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ হয়। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ফিরে পান। এরপর সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যেমন উদ্যোগ নেন, তেমনি সময়ের প্রয়োজনে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সমাজনীতি, নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সব ক্ষেত্রেই তিনি সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। রাজনীতিকে অস্থিরতা কাটিয়ে একটি সমন্বিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। সামরিক বাহিনীর লোক হয়েও তিনি রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। সাধারণত মিলিটারি শাসকেরা রাজনীতিবিদদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সামরিক সিদ্ধান্ত প্রয়োগের চেষ্টা করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান রাজনীতি ও সমরনীতির প্রভেদ বুঝতেন। দেশের একটি অন্ধকার সময়ে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেয়ে ১৯৭৫-এর ২৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া দ্বিতীয় ভাষণেই জেনারেল জিয়াউর রহমান অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।
জিয়াউর রহমান যখন জাতির হাল ধরেন, তখন জাতি হিসেবে আমরা ছিলাম বহুধাবিভক্ত। শেখ মুজিবুর রহমানের বাঙালি জাতীয়তাবাদ দেশের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে যে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে, তা দেশের অর্থনৈতিক, উন্নয়ন, সামাজিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয়তার পরিচয়ের এক অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। জাতীয় জীবনের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করেন।
‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে’র ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সব মতের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। ‘দেশ’ ও ‘মানুষ’ই তার রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শের পরিচয় একটা বক্তৃতার মাধ্যমে আমি তুলে ধরছি। ১৯৭৬-এর ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ অফিসারদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।’ (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ, ১৯৭৬)
জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় সেনাবাহিনী’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠা দিয়ে অফিসারদের নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগাতে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন তাদের।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সামরিক বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র গ্রুপের সংঘটিত অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলেও এটা সত্য যে, তিনিই সামরিক বাহিনীতে ঐক্য ও সংহতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রশস্ত্রের সমন্বয়ে ও সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীর মনোবলকে উন্নত স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দুর্বল-শক্তিশালী সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ সবার সাথে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বৈদেশিক নীতি নির্দিষ্ট ও বাস্তবায়ন করেন। জোট নিরপেক্ষ এবং ইসলামি দেশগুলো ও বিভিন্ন উন্নয়নকামী দেশের সম্মেলনে তার ব্যক্তিগত এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ গতি সঞ্চারিত হয়। ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদি সফলতাকে তিন ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, তিনি জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বব্যাপী শান্তির আবহ তৈরি করার লক্ষে বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদার উন্নয়ন ঘটান। ফলে বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি উপমহাদেশের জন্য একটি স্থানীয় শান্তি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আসিয়ানের মতো সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তীকালে সার্ক প্রতিষ্ঠা পায়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটা লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্যকে উৎসাহিত করা। তার শাসনকালে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা।
ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, ‘সাম্যের প্রতীক ও সৎ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ মালয়েশীয় দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে বলা হয়, ‘অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহামারী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর, ১৯৭৯)
এ সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও বিশ্ববাসী উচ্চ ধারণা পোষণ করে। বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি বহির্বিশ্বের আস্থা সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার আরেকটা অবদান হলো নাগরিক বাহিনী গঠনের চিন্তা বাস্তবায়ন করা। তিনি এক কোটি নারী ও পুরুষকে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দানের লক্ষে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) গঠনের মাধ্যমে দেশ গঠন ও নিরাপত্তায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেন। জিয়াউর রহমানের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পদক্ষেপ ছিল উল্লেখ করার মতো। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ প্রচার পেয়েছিল। জিয়াউর রহমান আমলানির্ভর প্রকল্প না করে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতে কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এভাবে জিয়াউর রহমান ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশকে রফতানিমুখী বাংলাদেশে পরিণত করতে সক্ষম হন। তার যোগ্য ও ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বন্ধুহীন বাংলাদেশ বন্ধুত্বের জাল বিস্তার করে বিশ্বে নেতৃত্বদানে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
এ বছরের ১৯ জানুয়ারি বিশ্বের নানা প্রান্তে নানান আয়োজনে জিয়াউর রহমানের ৮১তম জন্মদিন পালিত হতে যাচ্ছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মদিনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তার ভক্ত-অনুরক্ত ও আদর্শের ধ্বজ্জাধারী ধারক ও বাহকদের জন্য রইল অশেষ ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন।
লেখক: অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ ও সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিদ্রোহী দুই সৈনিক : নজরুল-জিয়া
- Created on Monday, 30 April 2018 15:32
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 1095
আবু সালেহ/ নয়া দিগন্ত
কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উভয়েই সৈনিক ছিলেন। চাকরিকালে পদমর্যাদায় নজরুল ছিলেন হাবিলদার ও জিয়াউর রহমান লেফটেন্যান্ট জেনারেল। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও ছিলেন। প্রথমজন ব্রিটিশের ভারত শাসনামলে, অপরজন পাকিস্তান-বাংলাদেশ আমলে। তবে উল্লেখ করা যেতে পারে দু’জনেরই সৈনিক জীবন শুরু হয় করাচিতে। নজরুলের কিশোর জীবন কেটেছে ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায়, নিজ গ্রামে। কিছু দিন ময়মনসিংহের ত্রিশালেও। জিয়াউর রহমানের কলকাতায়, পার্ক সার্কাসে। নিজ গ্রাম বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে অল্প সময় কেটেছে।
নজরুলের জীবনীগ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়, দুখু মিয়া অর্থাৎ নজরুল ইসলাম কিশোর বয়সে অত্যন্ত চঞ্চল ও দুরন্তপনার মাধ্যমে বেড়ে ওঠেন। স্কুলজীবন ছিল অনিয়মিত ইত্যাদি। অপর দিকে জিয়াউর রহমান ছিলেন ওই বয়সে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নিত্য গোছানো।
বিশিষ্ট কবি শহীদ কাদরী লন্ডনে বসবাসকালে ১৯৮১ সালে আমাকে জিয়া সম্পর্কে বলেছিলেন, জিয়ার স্কুলজীবন ছিল কাঁটায় কাঁটায় নিয়মিত, ডিউটিফুল। খেলাধুলায়, বিশেষ করে ক্রিকেট খেলার প্রতি ছিল বিশেষভাবে আকৃষ্ট। এই খেলছেন, এই চলছেন, গল্প-উপন্যাস পড়ছেন; সবকিছুই ছিল ছকে বাঁধা। সবসময়ই তাকে অ্যাকটিভ দেখা যেত। ক্লান্তিহীন ছিলেন তিনি।
কাজী নজরুল ইসলামের করাচিতে যাওয়া হয় সৈনিক হিসেবে বাঙালি পল্টনে যোগ দিতে। ব্রিটিশ শাসিত কলকাতা থেকেই তিনি সেখানে যান। জিয়াউর রহমান তার বাবার কর্মস্থল করাচিতেই ছিলেন এবং ওখান থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। বিশিষ্ট সমাজসেবক, আমলা এবং পরবর্তীতে মন্ত্রী ফরিদপুরের কৃতী সন্তান আকবর কবীরের কাছে শুনেছিলাম, করাচিতে থাকার সময় তরুণ জিয়া বাঙালি কমিউনিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জেনারেল ওসমানী তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার, মেজর। বাঙালি কমিউনিটির কোনো কাজে জিয়ার বিশ্বস্ততা, আন্তরিকতা এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তার সক্রিয় ভূমিকা আশ্বস্ত করত। বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের অবজ্ঞা এবং পীড়ন-নিপীড়ন প্রভৃতি আমাদের মতো জিয়াকেও ক্ষুব্ধ করে তোলে। বাঙালি যে শৌর্যবীর্যে, সম্পদে, জ্ঞানে গরিমায় শ্রেষ্ঠ এ কথাটি সে তার সহপাঠী ও বন্ধুদের কাছে তুলে ধরত এবং কখনো কখনো পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈরী আচরণের প্রতিবাদ করত।
কাজী নজরুল ইসলাম রুটির দোকানে কামলা খাটতেন এ কথা বহু জায়গায় লেখা হয়েছে। বলা হয়েছে, রুটির ময়দা তৈরি করতে গিয়ে তিনি ‘যত ডলবে ময়দা-তত ফলবে ফয়দা’ এই চরণ দু’টি রচনা করেন। বিশিষ্ট কবি কাজী কাদের নওয়াজ, যিনি নিজেও বর্ধমান জেলার এবং বিখ্যাত জমিদার তনয়, তিনি নজরুলের রুটির দোকানে কামলার কাজ করার কথাটি বানোয়াট বলেছিলেন। ‘যত ডলবে ময়দা, তত ফলবে ফয়দা’ তার রচিত নয়। এটি প্রচলিত ছড়া। রুটির দোকানেই হোক আর মাঠের বা খেত-খামারের দিনমজুরই হোক রুটি রুজির জন্য কাজ করা ঘৃণার কিছুই নয়। কাজ করে উপার্জন করা দোষের নয়। এতে আভিজাত্য ও মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ হওয়ার নয়। ওই যুগে ওটাই স্বাভাবিক ছিল। এ যুগেও রয়েছে। কিন্তু ওই সময়ে তার কর্মস্থল ও কর্মশ্রেণী নিয়ে অযথা কোনো কাহিনী ফলাও করা সমীচীন নয়। ব্রিটিশ শাসনের একজন দারোগার করুণার পাত্র হওয়া অথবা তার কথিত মহানুভবতার কাহিনীও অতিরঞ্জিত। নজরুলকে দারোগা সাহেব তার প্রয়োজনেই সাথে করে ত্রিশালে নিয়েছিলেন। সেই প্রয়োজনটির প্রকৃতি কোন উদ্দেশ্যের ছিল তা আজো রহস্যাবৃত আছে। তবে ‘মহানুভবতার’ হৃদয় যে অল্প দিনেই চৌচির হয়ে যায় তা বুঝতে পারি তখনকার ও এখনকার মানুষ। কেননা সেখানে নজরুল বেশি দিন থাকেননি। পরিণত বয়সে কৈশোর জীবনের কিছুকাল কাটানোর স্মৃতিবহ ত্রিশালকে তার হৃদয়ে তেমন সুখকর চারণক্ষেত্ররূপে পরিণতও হয়নি। যদি হতো তবে পরবর্তীকালে তার স্মৃতিময় ত্রিশালে বার বার আসতেন। ঘটনা যা-ই ঘটুক, একটি বিষয় প্রমাণিত, নজরুল কিশোর বয়স থেকেই পরিবারের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, কর্তব্যপরায়ণ এবং তাদের ভরণ-পোষণের জন্য দায়িত্বশীল। মক্তব্যের শিক্ষকতা, মসজিদের ইমামতি বা মোয়াজ্জিন হওয়া, লেটোদলে যোগদান প্রভৃতি সবকিছুই অর্থ উপার্জনের বিষয় ছিল, যা দিয়ে তার পারিবারিক প্রয়োজন মেটানো হতো। ত্রিশালে আগমনের পশ্চাতে কোনোরূপ উপার্জনের লক্ষ্য ছিল কি-না, তা কেউ বলেননি। স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে, বিনিময়ে কী কাজ করতে হতো সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য নিয়ে কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করেননি।
জিয়ার বিদ্রোহী মন গড়ে ওঠে সেই কৈশোরে কলকাতার পার্ক সার্কাস থেকেই। ক্রিকেট খেলতে গিয়েই ব্রিটিশ আমলা কর্মচারী সন্তানদের বৈরী আচরণ তাকে ভাবতে শেখায়। পাকিস্তান পর্বে একই আচরণও লক্ষ করেন করাচিতে পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা কর্মচারীদের ও তাদের সন্তানদের মধ্যে।
নজরুলের বিদ্রোহী মন কবে কিভাবে গড়ে ওঠে সে তথ্য কোনো মুরব্বির কাছে শুনতে পারিনি। যা জানার সবই বই-পুস্তকের মাধ্যমে। নজরুলকে নিয়ে সব লেখাই যে বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যনির্ভর তা বলা যাবে না। তার জীবনী, সাহিত্য, রাজনীতি ও সঙ্গীতজীবন নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাদের রচনা ভাণ্ডারেও প্রকৃত তথ্য যথাযথভাবে আছে বলে মনে হয় না। তবে একটি বিষয় বুঝতে অসুবিধা হয় না, চরম দারিদ্র্য ও অসহায় এতিম কিশোরের হৃদয়ে যে সময়ে আদর স্নেহ-ভালোবাসার প্রয়োজন ছিল এবং আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন ছিল, সেই সময়ে তিনি তা পাননি। এই না পাওয়া থেকে মার মনে নানা প্রশ্ন জাগে। ধীরে ধীরে সেই প্রশ্নাবলির আলোকে তার সমাজ, দেশ এবং স্বাধীনতার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা জাগ্রত হয়। মন উড়– উড়– হয় এবং পরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
শহীদ জিয়া জাতির এক মহাসঙ্কটময় মুহূর্তে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক ঘোষণাও দেন। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বও দেন। জাতির শত শত বছরের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন একাত্তরে।
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী হওয়ার আনুষ্ঠানিক কোনো দিন ক্ষণ তারিখ পাওয়া যায় না। গানে, কবিতায় তিনি তরুণদের তথা সারা জাতিকে বিদ্রোহী হওয়ার জন্য জাগরণ সৃষ্টি করেন। কার্যকর কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেননি। তার বিদ্রোহ ছিল মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক। জাগরণমূলক। মোটেই সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর নয়। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, নজরুল তার জায়গায় এবং জিয়া তার জায়গায় কৃতিত্বের অধিকারী।
নজরুল বিদ্রোহের গান গেয়েছিলেন ভারতবাসীর মুক্তির জন্য, সর্বহারা জনগণের মুক্তির জন্য এবং জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জন্য। শুধু ঘোষণা দিয়েই নয়, সেই ঘোষণাকে কার্যকর করার লক্ষ্যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক ভিত্তি রচনা করেন এবং রণাঙ্গনে শত্রু নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
১৭৫৭ সালে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শাসনক্ষমতা নবাব সিরাজদ্দৌলার নিহত হওয়ার পর ব্রিটিশের হাতে চলে যায়। নবাবের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য নয়, ব্রিটিশকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে পলাশী ট্র্যাজেডির পর থেকেই। অসংখ্য আন্দোলন, সংগ্রাম হয়েছে। বলা চলে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পুরো ১০০ বছর ধরে ভারতবর্ষের মানুষ ব্রিটিশবিরোধী চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে এবং জাতিকে ওইভাবে যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন নেতৃস্থানীয়রা। জাগরণের শতাব্দীকাল হিসেবে ওই পর্ব অতিবাহিত হয়। এই ১০০ বছর অর্থাৎ ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এই ১০০ বছর চলে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের কাল।
টিপু সুলতান, তিতুমীর, শরীয়তউল্লাহ প্রমুখ স্বাধীনচেতা ধর্মীয় ও সচেতন বীর পুরুষেরা এসব সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌলার পতনের পর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ হয়। সাফল্য অর্জিত না হলেও ওই বিদ্রোহ ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের অস্থির করে তোলে।
১৮৫৭ থেকে ১৯৫৭ সাল। এই ১০০ বছরের ইতিহাসও সবার জানা। এই শতকে ব্রিটিশবিরোধী যেসব যুদ্ধ ইত্যাদি সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলন, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বঙ্গভঙ্গ, তিতুমীরের আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, স্বদেশী আন্দোলন, আজাদ হিন্দ আন্দোলন, ’৪০-এর লাহোর প্রস্তাব ইত্যাদি।
১৯৫৭ সালে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের কামগারীতে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি সরাসরি আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে প্রকৃত অর্থে বাঙালিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর পাকিস্তানি শাসকেরা সতর্ক হন। নানা ছুতায় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের অস্তিত্ব অস্থির করে তোলেন এবং এক সময়ে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মার্শাল ল’ জারির মধ্য দিয়ে করায়ত্ত করেন।
সব বাধানিষেধের মধ্যেও এই নিশ্ছিদ্র সামরিক আইনের অন্ধকারেও শুরু হয় বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের নীরব অভিযান। ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬, ৬৭, ৬৯-এর আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, ৭০-এর ভোট সংগ্রাম, সবই সেই অভিযানেরই খেয়া। এই খেয়ার হাল শুরুতে যারা ধরেছিলেন শেষ অবধি তাদের অনেকেই আর কেউ ছিলেন না। এক একটি খেয়াযান তার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী উজানমুখো হয়। সব খেয়াই যে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে তা বলা সঙ্গত হবে না। তবে কোনো খেয়ার অভিযানই বৃথা যায়নি। চূড়ান্ত পর্বের অভিযানে যে খেয়াটি অতিক্রম করার কথা, যে নাবিককে শক্ত হাতে হাল ধরার কথা এই পর্বে তার বীরত্ব আপসের চোরাবালিতে নুইয়ে পড়ল। খেয়াটি যখন মহাসঙ্কটে, ঝড়ঝঞ্ঝায় পতিত, সে সময়ে হাল ধরা সেই মাঝিকে আর পাওয়া গেল না। যুদ্ধের সব রসদসহ খেয়াকে পাঁকে ফেলে যখন তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন, সে মুহূর্তে জিয়া কঠিন ঝুঁকি নিয়ে খেয়ার হাল ধরলেন। আর এই হাল ধরার তাৎক্ষণিক মন্ত্র পেয়েছিলেন তিনি আরেক সৈনিক নজরুলের কাছ থেকে। সেই মন্ত্রটি ছিল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতা’
দুর্গম গিরি কান্তর মরু দুস্তর পারাবার
লংঘিত হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল ভুলিতেছে মাঝি পথ
ছিঁড়িয়াছে পাল কে ধরিবে হাল আছে কার হিম্মৎ
কে আছো জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি নিতে হবে তরী পার।
এর পরেও এই বাংলাদেশ এই জাতি এবং এর সার্বভৌমত্ব পড়েছিল হুমকির মুখে; যখন বাংলাদেশে দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল ভুলিতেছে মাঝি পথ…, তখন সেই ১৯৭৫-এর ভয়ঙ্কর দুর্যোগের কালেও তো জাতির হাল ধরতে এগিয়ে এসেছিলেন জিয়াউর রহমান। এবারেও তার মন্ত্র নজরুলের আর একটি কবিতা,
চল্ চল্ চল্,
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল, চল্ চল্ চল।
একটি কথা এখানে উল্লেখ করলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তা হলো নজরুলের চেতনা ও জাগরণ জিয়াকে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নজরুলের গানকে রণসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা, নজরুলের ঢাকা প্রবাসকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে তাকে নাগরিকত্ব প্রদান, জাতীয় কবির সম্মানে ভূষিত করা এবং সবশেষে তার কফিন নিজে বহন করে মসজিদের পাশে সামরিক অভিবাদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা ইত্যাদি জিয়াই সম্পাদন করেন।
নজরুল যে চেতনায় জাতিকে জেগে ওঠার আহ্বান জানান, জিয়া ছিলেন তারই কার্যকর সিপাহসালার। ইতিহাসের মহানায়ক।
লেখক : ছড়াকার, সাংবাদিক।
জিয়াউর রহমানের সামরিক এবং রাজনৈতিক জীবন থেকে নেতৃত্বের তিনটি শিক্ষা
- Created on Monday, 30 April 2018 15:27
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 768
ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ![]()
অনেক ভাবেই, অনেক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই একজন নেতার মূল্যায়ন করা যায়। এরকম প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – শৃঙ্খলাবোধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা এবং বিচক্ষণতা। অন্য অনেক গুণের সাথে এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন বলেই জিয়াউর রহমান একজন উঁচুমানের নেতা হতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবন বেশ দীর্ঘ হলেও উনার রাজনৈতিক জীবনের সময়কাল খুবই ছোট। সেনাবাহিনীতে তিনি যেমন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, রাজনীতিতেও অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। উন্নত মানের নেতৃত্বের গুণাবলী এবং দক্ষতার কারণে অল্প সময়ে একদিকে যেমন তিনি অনেক বেশী কাজ করেছেন, অন্য দিকে তেমনি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের লক্ষ্যে অনেক কিছুর সূত্রপাত করেছেন। যেমন, স্বাধীনতা ও একুশে পুরস্কার, নতুনকুঁড়ি আসর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, যুব মন্ত্রণালয়, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, খাল খনন সহ বহুবিধ সংস্থা এবং সংগঠন। সৎ, নির্লোভ জীবন যাপনের কারণেই উনার পক্ষে এত অল্প সময়ে এত বেশী কাজ করে সম্ভব হয়েছিল। এর নেপথ্যে উনার যে বৈশিষ্ট্য কাজ করেছে তা হচ্ছে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন। সুশৃঙ্খল জীবন যাপন না করলে কারো পক্ষে অল্প দিনে বেশী কাজ করা সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীর ট্রেনিং এবং পরিবার থেকেই জিয়াউর রহমান এরকম সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করতে চাইলে, উনার আদর্শের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতে চাইলে প্রতিটি জাতীয়তাবাদীকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে দেশ ও জাতি গঠনে উনাকে অনুসরণ করা সম্ভব হবে না। জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি তারেক রহমানও কিন্তু এরকম সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তারেক রহমানকে কিন্তু কোন মিটিংয়ে দেরিতে উপস্থিত হতে দেখা যায় না। ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে মিটিং করার জন্য উনাকে নয় হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হয়েছিল। কোন একটা মিটিং উনি দেরিতে উপস্থিত হন নি বলেই উনার সাথে ভ্রমণকারী সাংবাদিকদের রিপোর্ট থেকে জানা যায়। চাইলেই কারো পক্ষে এত দীর্ঘ ভ্রমণে এতগুলি সভা-সমাবেশে এরকম সময়মতো উপস্থিত হওয়াটা সম্ভব না, যদি না তাঁর ঘড়ির কাঁটা ধরে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের অভ্যাস থাকে। বাবার সাথে মায়ের সুশৃঙ্খল জীবন যাপন প্রণালী যে তারেক রহমানের এ রকম সুশৃঙ্খল জীবন গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে তা বলাই বাহুল্য। তাই জাতীয়তাবাদী আদর্শের সৈনিকদের তাদের প্রিয় নেতাদের অনুসরণ করে সময়ের মূল্য দিতে শিখতে হবে, সুশৃঙ্খল জীবন গড়ে তুলতে হবে। এতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত এবং সামাজিক বা রাজনৈতিক জীবনে সফল হওয়া সহজ হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তা বাস্তবায়ন করাই নেতার অন্যতম প্রধান কাজ। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় একটা প্রধান নিয়ামক। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা যেমন জরুরী, সঠিক সময়ে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও জরুরী। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঠিক সময় নির্ধারণ করতে না পারলে সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, এমনকি ভয়াবহ পরিণতিও হতে পারে সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়ার পরও, যদি সময় ঠিক না থাকে। জিয়াউর রহমানের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দে তে পাই ৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী একটা সিদ্ধান্ত। বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর নিজেকে নিরাপদ রাখতে না পারলে, রক্ষা করতে না পারলে ফাঁসির রশিতে ঝুলতে হতো। এক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করার সঠিক সিদ্ধান্তটা সঠিক সময়েই নিয়েছিলেন। উনাকে যখন অস্ত্র খালাসের জন্য বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন যদি উনি যেতে অস্বীকার করতেন, বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন তাহলে বন্দি হতে হতো, কোর্ট মার্শালে জীবন যেতো। তা না করে তিনি আপাতত নির্দেশ মেনে নিয়ে কমান্ডিং অফিসার জানজুয়ার অফিস থেকে বের হন । অন্যদিকে ঢাকা থেকে পাকিস্তান আর্মির ক্র্যাকডাউনের খবর পেয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে সেক্টর কমান্ডার হওয়া আর্মি অফিসারদের মধ্যে উনিই সবার আগে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। যখন দেখেছেন নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব, নিরাপদ রাখা সম্ভব – এ রকম সঠিক সময়ে বিদ্রোহ করার মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন বলেই একদিকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন, অন্যদিকে জাঞ্জুয়াকে গ্রেফতার ও হত্যা করতে পেরেছেন সেদিন। সিদ্ধান্তের সময়ের হেরফের হলে শুধু যে উনার নিজের জীবন যেতো তাই না স্বাধীনতার ইতিহাসও হয়ত অন্য রকম হতো। কেননা, সেই রাতে তিনি গ্রেফতার হলে বা জীবন হারালে পরের দিন পথহারা জাতিকে পথ দেখানো আশার আলো ঝলকানি, আত্নবিশ্বাসের বাণী – ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’ দেশবাসী শুনতে পেতো না। ফলে স্বাধীনতার যুদ্ধ কতটুকু প্রলম্বিত হতো তা অনুমান করা যায় না, মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে দক্ষ এবং ড. আসিফ নজরুলের বর্ণনায় ‘ব্যতিক্রমী সেক্টর কমান্ডার’কে পাওয়া যেতো না। শুধু যে সময় মতো বিদ্রোহ ঘোষণা তা নয়, এরপর বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেও উনি দেরি করেন নাই। নিজে ড্রাফট করে ঘোষণা দিয়েছেন বেতারে। পরবর্তীতে সেই ঘোষণায় প্রয়োজনীয় উন্নয়নও করেছেন সেই সময়কার তুমুল জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার কথা বলে। এটা উনার বিচক্ষণতার প্রমাণ। এখানে সময়ের চাহিদাকে বুঝতে পারা, তাকে কার্যকর করার এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতার প্রমাণই মিলে।
অন্যদিকে আমরা যদি ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাই, সেখানেও দেখা যায় উনার সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। সেই সময় যদি কর্নেল তাহেরদের ক্যান্টনমেন্টের বাইরে যাওয়ার প্রস্তাব বাতিল করে দিতে না পারতেন, বিচক্ষণতার পরিচয় না দিতে পারতেন, তাহলে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ অন্যরকম হতো। তাই জাতীয়তাবাদীদের মনে রাখতে হবে যে, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা যেমন জরুরী; সঠিক সময়ে নেওয়া এবং সময়ের চাহিদার সাথে তাতে প্রাসঙ্গিক সংশোধনী আনতে পারাটাও খুবই দরকারি। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দুইটা বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক সিদ্ধান্ত সঠিক হচ্ছে কিনা। দুই, সিদ্ধান্তটা সঠিক সময় ঘোষণা দেওয়া বা কার্যকর করা হচ্ছে কি না।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ থেকে আরেকটা বড় শিক্ষণীয় আছে জাতীয়তাবাদীদের জন্য। সেটা হচ্ছে, ভাল নেতা হলে উন্নত মানের নেতা হলে ঘটনাপ্রবাহ আপনার হাতে নেতৃত্ব তুলে দেবে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতার জন্য লালায়িত ছিলেন না। তাই ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে বলছিলেন, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট আছেন’। চেইন অব কমান্ড মেনে সেনাবাহিনীর একজন থাকার দিকেই উনার অবস্থান ছিল, নিজ হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কোনো প্রচেষ্টা আমাদের নজরে আসে না। কিন্তু সততা, দক্ষতা আর দেশপ্রেমের কারণে অর্জিত জনপ্রিয়তার কারণে সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ উনাকে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল।
কিন্তু বিচক্ষণ, সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দক্ষ জিয়াউর রহমান এখানেও সিদ্ধান্ত নিতে ভুল বা দেরি করেন নাই। যাকে না বলার তাকে না বলে দিয়েছেন, যেখানে হ্যাঁ বলার সেখানে হ্যাঁ বলেছেন। ফলে সেই সংকটময় মুহূর্তে জাতি আবারো একাত্তরের মতো দিকনির্দেশনা পেয়েছে, পরে ধাপে ধাপে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফেরত পেয়েছে। এখান থেকে জাতীয়তাবাদীদের জন্য শিক্ষণীয় হচ্ছে – সততা, দক্ষতায় নিজেকে উন্নত করে তুলুন; পদ পদবি এসে আপনার পায়ে গড়াগড়ি খাবে। পদ পদবি বা ক্ষমতার জন্য আপনাকে দেনদরবার করতে হবে না, ধামাধরা হতে হবে না। সময় ও ঘটনাপ্রবাহ আপনার পায়ে সে সব ঠেলে দেবে। পানি নিচের দিকে গড়ায় প্রাকৃতিক নিয়মে, নেতৃত্ব উপরের দিকে, মানে উন্নত নেতার হাতে যায়। নিজের নেতৃত্বের মান উন্নত করুন, পদ পদবি, নেতৃত্ব চলে আসবে আপনার হাতে পায়ে। তবে সময়ের সাথে নিজেকে আপগ্রেড করতে হবে, বিশেষ করে যোগাযোগ প্রযুক্তিতে। তা না হলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে এবং নেতৃত্ব হাতছাড়া হয়ে যাবে। এক কথায় যদি আজকের বিএনপির সমস্যা চিহ্নিত করা হয়, তাহলে সেটা জনগণের সাথে দুর্বল যোগাযোগ। যথাযথ শব্দচয়ন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের সাথে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে বিএনপি সহজেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারে।
জাতীর এই ক্রান্তিলগ্নে জাতীয়তাবাদীরা জিয়াউর রহমানের জীবন থেকে বিশেষ করে উনার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা দেখিয়ে দিকহারা পথহারা এই জাতিকে আবার পথ দেখাবে এটাই প্রত্যাশা।
– ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ, নেতৃত্ব ও যোগাযোগ-এর একজন উৎসাহী গবেষক ও বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রাম ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম
- Created on Monday, 30 April 2018 15:31
- Category: প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শ
- Hits: 767
ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে
বিশেষ আবেগ। পবিত্র নগরী জেরুসালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন প্রতিটি ফিলিস্তিনি নাগরিক দেখে থাকে, সে স্বপ্নের অংশীদার এ দেশের মানুষ। ফিলিস্তিনে
র স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি এ দেশের মানুষের সমর্থন নিরবচ্ছিন্ন। এই সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রাণপুরুষ ইয়াসির আরাফাতের প্রতি এ দেশের মানুষের রয়েছে বিশেষ শ্রদ্ধা। সর্বকালের সেরা গেরিলা যোদ্ধাদের একজন ফিলিস্তিনের সংগ্রামী নেতা ইয়াসির আরাফাতের নামে সত্তর ও আশির দশকে এ দেশে বহু সন্তানের নাম রাখা হতো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি এ দেশের মানুষ সমর্থন দিয়ে আসছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক বাংলাদেশী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এদের অনেকে লড়াইয়ে অংশ নিয়ে শাহাদতবরণ করেন। আবার অনেকে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ যখন লাহোরে ওআইসি সংম্মেলনে অংশগ্রহণ করে সে সময় বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সাথে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গনাইজেশন প্রধান ইয়াসির আরাফাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ফিলিস্তিনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়। এ সময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। ঢাকার ফিলিস্তিনি দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৩ বার রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন। এর মধ্যে ৯ বার এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর তিনি গভীর হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ করেন। দুই নেতা বহু আন্তর্জাতিক ফোরামে একসাথে কাজ করেছেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন আলকুদস কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মরক্কোর বাদশাহ দ্বিতীয় আল হাসান এবং সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল। ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে আল কুদস কমিটির নেতৃত্বে জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া জিয়াউর রহমান ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ মোহাম্মদ আলী ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমাকে জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরামর্শে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক ফিলিস্তিনের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।
জিয়াউর রহমানের সময় ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশের মিলিটারি স্কুল ও কলেজ এবং মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য অবারিত সুযোগ দেয়া হয়। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত বহু ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে লেখাপড়া করেছে। ইসরাইলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিভিন্ন সময় জাতিসঙ্ঘে উত্থাপন করেছেন। এমনকি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ফিলিস্তিন দূতাবাসের জন্য ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়।
জিয়াউর রহমানের সময় ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পরে বাংলাদেশের সব সরকার ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সমর্থন দিয়ে আসছে। তার ধারাবাহিকতা আজো বিদ্যমান। বেগম খালেদা জিয়ার সরকারও আন্তর্জাতিক ফোরামে সব সময় ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সাথে ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। যে বন্ধন এখনো অটুট আছে। গাজায় ইসরাইলের বর্বরতার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল ফিলিস্তিন দূতাবাসে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। অপর দিকে গত নভেম্বরে ফাতাহর সপ্তম ন্যাশনাল কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকবে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহে ফিলিস্তিনের জনগণ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এক দিকে দখলদার বাহিনী তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করছে, অপর দিকে পবিত্র নগরী জেরুসালেমকে নিয়ে ইসরাইল এক নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মাত্র কিছু দিন আগেও ইসরাইল প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিল। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে বসতি নির্মাণ বন্ধে প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের পক্ষে ভেটো প্রদান থেকে বিরত ছিল। এ ছাড়া প্যারিসে ফিলিস্তিন বিষয়ে ৭০টি রাষ্ট্রের এক সম্মেলনে দুই রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো এই সঙ্ঘাত নিরসনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্যারিস সম্মেলনে তিনটি বিষয়ে ওপর সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এর মধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করা এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করা। মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দুই রাষ্ট্রের ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সম্প্রতি মস্কোয় ফাতাহ এবং ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ঐক্য সরকার গঠনের ব্যাপারে একমত হয়েছে। বৈঠক শেষে ফিলিস্তিনি নেতারা রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে না সরানোর ব্যাপারে রাশিয়ার প্রভাব খাটানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইসরাইলের এ নীতির সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে সতর্ক করা হয়েছে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়া হলে ফিলিস্তিনি জনগণ আরো বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। বড় ধরনের রক্তপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ও ইসরাইলি আগ্রাসন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সমর্থন এখন অত্যন্ত জরুরি। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেতে তিন দিনের সফরে ঢাকা এসেছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও আরো বেশ কিছু দেশ সফর করবেন বলে ধারণা করা যায়। আমরা আশা করব শুধু মুসলিম বিশ্ব নয়, মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে প্রতিটি দেশ ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়াবে। ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর দশকের পর দশক ধরে যে নিপীড়ন চলছে তার অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। অন্য যেকোনো দেশের মানুষের চেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্ব এ দেশের মানুষ বেশি উপলব্ধি করে। এ কারণে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি এ দেশের মানুষের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরো বেশি সুদৃঢ়।
লেখক : বিএনপি চেয়ারপার্সন’র উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
নয়া দিগন্ত
সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান
মহাসচিব
বেগম জিয়া টুইটারে
বিএনপি টুইটারে
বিএনপি ফেসবুকে
বিএনপি ইউটিউবে
ভিজিটর
নামাজের সময়সূচী
| ওয়াক্ত | শুরু | জামাত |
| ফজর | ৫-০৬ | ৫-৪৫ |
| জোহর | ১২-১৪ | ১-১৫ |
| আসর | ৪-২৩ | ৪-৪৫ |
| মাগরিব | ৬-০৬ | ৬-১১ |
| এশা | ৭-১৯ | ৮-০০ |
ফেসবুকে আমরা
চাকরির খবর
সর্বশেষ সংবাদ
- বিশ্বকাপের আগে ব্যস্ত ভারত, বাংলাদেশের ভরসা শুধু বিপিএল
- ইনস্টাগ্রামে আবেদনময়ী ছবি শেয়ার, কটাক্ষের মুখে শ্রাবন্তী
- প্রবাসীদের নিবন্ধন ছাড়াল ৩ লাখ ৭ হাজার
- আলোচনা সভায় তারেক রহমান ধানের শীষ বিজয়ী হলে দেশ রক্ষা পাবে
- ডা. জাহিদের ব্রিফিং চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন খালেদা জিয়া
- আগামী নির্বাচন জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের পথ খুলে দেবে: গয়েশ্বর
- ভোটে জিততে জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে হবে: মির্জা ফখরুল
- আজকের মুদ্রা রেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
- যুক্তরাষ্ট্রে চলন্ত গাড়ির ওপর আছড়ে পড়ল বিমান
- এমবাপ্পের আরেক রেকর্ড ভেঙে দিলেন জার্মান বিস্ময়বালক
- প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে যে কঠোর সমালোচনা করলেন কেট উইন্সলেট
- বিএনপির মিত্ররা ‘একাট্টা’, কাল বৈঠক
- নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র জনগণ হতে দেবে না: নজরুল
- তারেক রহমান জনগণ দায়িত্ব দিলে আবারও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত বিএনপি
- অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন তারেক রহমান












